পর্দা বা হিজাব কি সত্যিই ধর্ষণ কমায়??
মানুষ ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে, বাড়ির সামনে গেইটে তালা ঝুলায়, ঘরের মধ্যে দরজা লাগায়, ছিটকিনি লাগায়, ঘরে দা-বন্দুক রাখে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে অতঃপর ঘুমাতে যায়। নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রায় শতভাগ সতর্ক থাকা সত্ত্বেও সেসব বাড়িতে চুরি-ডাকাতি হয়। ডাকাতদল সকল নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙ্গে, গৃহকর্তা-গৃহকর্তীর কাছ থেকে চাবি নিয়ে আলমারি/সিন্ধুক ভেঙ্গে মূল্যবান গয়না নিয়ে যায়, টাকা নিয়ে যায়।
ঘরের তালা ভেঙ্গে চুরি-ডাকাতির ঘটনা অহরহ ঘটে। গেইট, তালা, দরজা কেনা হয়েছিলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য, দেখা যায় সেগুলোও কোনো নিরাপত্তা দিতে পারেনি। এই পরিস্থিতিতে কেউ কেউ কিছু প্রশ্ন তুললো। প্রশ্নগুলো এমন:
‘অমুক বাড়িতে এতো শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও ডাকাতি হয়েছে, তাহলে আমরা কেনো বাড়িতে তালা ঝুলাবো? তালা ঝুলিয়েও যদি ডাকাতি হয় তাহলে তালা ঝুলানোর দরকার আছে? মার্কেটে দারোয়ান, নাইট-ওয়াচম্যান থাকা সত্ত্বেও যদি ডাকাতি হয় তাহলে এখন থেকে আর বেতন দিয়ে তাদেরকে রাখার দরকার নাই।’
প্রশ্নগুলোর ফাঁকফোকর খুব সহজেই ধরা পড়ে। কারণ, ‘চুরি-ডাকাতি কেনো হচ্ছে, এটার প্রতিকার কী?’ সেই আলোচনা না করে যখন ডালপালা নিয়ে আলোচনা হয় তখন জোড়াতালি-মার্কা উত্তর খুঁজতে হয়। একটা সমাজ যতোটা সভ্য হোক না কেনো, সমাজের সবাই যতোই স্বাবলম্বী হোক না কেনো, সেই সমাজে চুরি-ডাকাতি ১০০% বন্ধ করা সম্ভব না।
চুরি-ডাকাতি সংগঠিত হবার পর ভিক্টিমের দিকে আঙ্গুল না তুলে আঙ্গুল তুলতে হয় ক্রিমিনালের দিকে। কারণ, ভিক্টিম তো তার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছে চুরি-ডাকাতি ঠেকানোর। কিন্তু, চোর-ডাকাত তো তারচেয়েও এডভান্স। ভিক্টিমের ঘরে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি কতোটুকু ছিলো, নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরেকটু ভালো হলে চুরি-ডাকাতি হতো কি-না এই হাইপোথিসিস নিয়ে পরে আলাপ করা যাবে। আগে চোর-ডাকাতকে খুঁজে বের করতে হবে, তাদেরকে শাস্তি দিতে হবে। একটা বাড়ির নিরাপত্তা যতোই নড়বড়ে হোক না কেনো, শুধুমাত্র এই কারণে চোর-ডাকাত সেই বাড়িতে চুরি-ডাকাতি করতে পারে না।
একটা ধর্ষণের পর প্রায়ই ধর্ষিতার কাপড়ের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। একপক্ষ বলে, ধর্ষণের জন্য ধর্ষিতার পোশাক দায়ী, আরেকপক্ষ বলে ধর্ষণের সাথে পোশাকের কোনো সম্পর্ক নেই। এই ধরণের বিতর্ক ক্ষতিকর। কারণ, এই বিতর্ক ক্রিমিনাল-ধর্ষকের দিকে আঙ্গুল না তুলে আঙ্গুল তুলে মাজলুম-ধর্ষিতার দিকে। এই বিতর্কে ঢাকা পড়ে যায় ধর্ষকের কুৎসিত চেহারা, ক্যামেরার লেন্স ঘুরে যায় ধর্ষিতার দিকে। এক পর্যায়ে ধর্ষিতা হয়ে যায় ধর্ষণের মূল ক্রিমিনাল!
‘পোশাকই ধর্ষণের একমাত্র কারণ’ কথাটি কুরআন-হাদীসের কথা না। কিন্তু, ধর্ষণের আগে-পরে এমন জোরেশোরে কথাটি প্রচারিত হয় যে, মনে হয় এই কথাটি এবসিলিউট; এই কথাটি কেউ বিশ্বাস না করলে সে ঈমানদার হতে পারবে না!
এই কথাকে ভুল প্রমাণের জন্য আরেকদল উঠেপড়ে লাগে। যখন পূর্ণাঙ্গ পর্দা পালন করা সত্ত্বেও কেউ ধর্ষণের শিকার হয়, তখন সেই গ্রুপটি বিদ্রুপ করে বলে- ‘এই দেখো ইসলামের ব্যর্থতা, আগে না বলছিলা পর্দা করলে কেউ ধর্ষণ হবে না!?’ তখন তারা অন্যসব পর্দানশীলদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে- ‘পর্দা করেও যদি ধর্ষণের শিকার হতে হয়, তাহলে পর্দা করার কী দরকার? যে পর্দা তোমাকে ধর্ষণ থেকে নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেই পর্দা করে লাভটা কী?’
ধর্ষণের সাথে পোশাকের সম্পর্ক দেখানোর এই বিতর্কটি মূলত দুই প্রান্তিক জায়গা থেকে আসে। এই দুই প্রান্তিকতার কেন্দ্রবিন্দু খুঁজতে চাইলে পর্দার বিধানের হকীকত দেখতে হবে। তা না হলে সারাদিন, সারারাত বিতর্ক করে এর সমাধান পাওয়া যাবে না।
পর্দার বিধান হলো ডুয়েল কানেকশন, সিঙ্গেল কানেকশন না। এটা মোটরসাইকেলের দুই চাকার মতো। পুরুষের জন্যও পর্দা ফরজ, নারীর জন্যও পর্দা ফরজ।
পুরুষ দৃষ্টি সংযত রাখবে, নারীও।
পুরুষ শালীন পোশাক পরবে, নারীও।
পুরুষ মাহরাম, নন-মাহরাম মেনে চলবে, নারীও।
নারীর-পুরুষের পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখা নিয়ে ইসলামের বিধান আছে, নারী-পুরুষের কথোপকথন নিয়েও ইসলামের বিধান আছে। পর্দার বিধান ইসলাম স্রেফ কাপড় বা দৃষ্টি সংযত রাখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেনি। পর্দার বিধান তারচেয়েও ব্যাপক।
নারী-পুরুষ পর্দার বিধান সম্পূর্ণ মানা সত্ত্বেও কি তারা ধর্ষণ থেকে নিরাপদ? সমাজের প্রত্যেকেই যথাযথ পর্দা করে চললো, তবুও কি সেই সমাজে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটবে?
থিওরিটিক্যালি উত্তর হলো- না। সমাজের শতোভাগ যদি সৎ হয়ে যায়, তাহলে সেই সমাজে ধর্ষণ করবে কে? সেই পুরুষটিরও তো দৃষ্টি সংযত করার কথা।
কিন্তু, প্রাকটিক্যালি এমন সমাজের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। মানব ইতিহাসে এরকম কোনো সমাজ হতে পারে না, যেই সমাজে কোনো ক্রাইম নাই, সমাজের শতোভাগ মানুষ পাপাচারমুক্ত, সৎ, নিষ্পাপ। তারমানে, একটা সমাজের প্রায় ৯৯.৯৯% মানুষ পর্দানশীল হওয়া সত্ত্বেও সেই সমাজে ধর্ষণের রেট শূন্য হবে না।
মানব ইতিহাসের সর্বোত্তম যুগ ছিলো রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুগ। মানব ইতিহাসের (একই সময়ের) সর্বোত্তম মানবগোষ্ঠী হলেন সাহাবীগণ। সেই যুগে একজন পর্দানশীল মহিলা সাহাবী ফজরের নামাজ পড়তে যাবার সময় ধর্ষণের শিকার হোন!
ধর্ষণ করে লোকটি চলে যায়। ধর্ষিতা সাহাবী আরেকজন লোককে দেখে তাকে অভিযুক্ত করেন। আদতে সে আসল অপরাধী ছিলো না, সে ছিলো নির্দোষ। রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে বিচার গেলো। নির্দোষ লোককে বাঁচাতে এবার ধর্ষক গিয়ে আত্মসমর্পণ করে বললেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমিই অপরাধী।”
অভিযুক্ত সনাক্তের পর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ধর্ষিতা সাহাবীকে বললেন, “তুমি চলে যাও, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করেছেন।” অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ধর্ষককে শাস্তির নির্দেশ দিলেন। [সুনানে আবু দাউদ: ৪৩৭৯]
‘পর্দা একজন মেয়ে-মহিলাকে ধর্ষকের হাত থেকে বাঁচাতে পারে না’ এটার একটা ক্লাসিক্যাল ঘটনা হলো রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুগের ঘটনাটি। হালআমলে এমন অসংখ্য ঘটনা দেখা যায় যে, পর্দা করেও মেয়ে-মহিলারা ধর্ষণের শিকার হোন, ৭-৮ বছর বয়সী ছোটো বাচ্চারাও ধর্ষণের শিকার হয়।
তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, পোশাকের পর্দা কেনো করবো? এই উত্তর দেবার আগে ইবাদাতের উদ্দেশ্য কেন্দ্রীক আরেকটা দৃষ্টি আকর্ষণীর চেষ্টা করি।
আমরা নামাজ পড়ি কেনো? এই প্রশ্নের সোজাসাপটা উত্তর- আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহ বলেছেন নামাজ পড়তে, এজন্য আমরা নামাজ পড়ি। নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখিয়ে গেছেন কিভাবে নামাজ পড়তে, আমরা সেভাবে নামাজ পড়ি।
নামাজ পড়ার কিছু দুনিয়াবী কল্যাণ আছে। যেমন: শারীরিক ব্যায়াম হয়। ঠিক এই উদ্দেশ্যে কেউ যদি নামাজ পড়ে যে, নামাজ পড়লে তার শরীর ফিট থাকবে, সে নামাজ পড়ার জন্য পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবে বলে অসুস্থ হবে না; তাহলে তার নামাজের আসল উদ্দেশ্যটাই ভুল। নামাজকে সে ব্যায়াম হিশেবে নিচ্ছে, আল্লাহর নির্দেশ হিশেবে নয়।
ঠিক একই কথা পর্দার বেলায়ও। পর্দা পালন করা আল্লাহর নির্দেশ। আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে গিয়ে যদি দুনিয়াবী কল্যাণ হাসিল হয়, তাহলে আলহামদুলিল্লাহ, না হলেও আলহামদুলিল্লাহ। ইবাদাতের ক্ষেত্রে আমার নিয়্যতের প্রায়োরিটি কি আল্লাহকে খুশি করা, নাকি দুনিয়াবী স্বার্থ হাসিল করা?
একটা ইবাদাতের ক্ষেত্রে দুনিয়াবী স্বার্থ যদি মুখ্য থাকে, আর যদি সেটা পূরণ না হয় তাহলে খোদ সেই ইবাদাত নিয়েই প্রশ্ন উঠে। আর ইবাদাতের ক্ষেত্রে যদি আল্লাহর হুকুম পালন করে সন্তুষ্টি কামনা মুখ্য থাকে, তাহলে সেটার প্রতিদানের জন্য অপেক্ষা করতে হয় আখিরাতে।
নবিজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
“কাজ নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে ইহকাল লাভের অথবা কোনো মহিলাকে বিয়ের উদ্দেশ্যে, তবে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে, যেজন্য সে হিজরত করেছে।” [সহীহ বুখারী: ১]
হিজরতের মতো কষ্টসাধ্য কাজও যদি কেউ দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে করে, সে প্রতিদান পাবে এই উদ্দেশ্যের জন্য। কেউ যদি পোশাকের পর্দা করেন এই আশায় যে, তিনি ধর্ষণ থেকে সুরক্ষিত থাকবেন, তারপরও যদি তিনি ধর্ষণের শিকার হোন তবে স্বভাবতই তার মনে প্রশ্ন জাগবে- পর্দা করে তাহলে কী হলো?
ঠিক এই কারণে ইবাদাতের আগে নিয়্যতকে পরিশুদ্ধ করা জরুরি। আমার পর্দার উদ্দেশ্য কি ধর্ষণ প্রতিরোধের জন্য, নাকি আল্লাহর বিধান পালনের জন্য?
আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন:
“বলো, আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু সারা জাহানের প্রভু আল্লাহর জন্য।” [সূরা আল-আন’আম ৬:১৬২]
এবার চলে যাই ঐ প্রথম উদাহরণে। ঘর-বাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গেইট, তালা ব্যবহার করা সত্ত্বেও চুরি-ডাকাতি হলে কি দোষটা গেইট-তালার হবে? না। ঠিক তেমনি, পর্দা পালন সত্ত্বেও কেউ যদি ধর্ষণের শিকার হয় তাহলে দোষটা পর্দার হবে না। একটা সমাজে চুরি-ডাকাতির মাত্রা কেমন বুঝার জন্য দেখতে হবে সেই সমাজের মানুষ কতোটা সৎ, সামাজিক সম্প্রীতি কেমন, সেই সমাজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতোটা ভালো।
একটা সমাজের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি ভঙ্গুর হয়, সামাজিক সম্প্রীতি যদি না থাকে, একের বিপদে অন্য যদি পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে ঘর-বাড়িগুলো যতোই তালাবদ্ধ থাকুক না কেনো, চোর-ডাকাত এসে সহজে আক্রমণ করবে। আশেপাশের লোকজন নীরব থাকার ফলে ভিক্টিম সাহায্যের জন্য কাউকে পাবে না, অপরাধী বুক ফুলিয়ে সমাজে হাঁটবে, কেউ তাদেরকে কিছু বলতে পারবে না। অপরাধীদের স্বাধীনতা দেখে অন্যান্য সহজ-সরল লোকগুলোও প্রভাবিত হবে চুরি-ডাকাতির মতো কাজে। কারণ, সমাজে চুরি-ডাকাতি বিনা মূলধনে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে!
ধর্ষণসহ নারী-পুরুষের দ্বারা সংগঠিত হতে পারে এমন পাপাচারের রাস্তা ইসলাম থিওরিটিক্যালি বন্ধ করেছে। তারপরও যদি সমাজের কেউ আল্লাহর বিধানকে অমান্য করে পাশবিক কর্মকাণ্ড করে, ইসলাম তার জন্য রেখেছে দৃষ্টান্তমূলক প্রাকটিক্যাল শাস্তি।
পুরো লেখাটি পয়েন্টাকারে সামারি করে নিই:
১। একজন মেয়ে-মহিলা বেপর্দায় চলে বলেই তাকে ধর্ষণ করা বৈধ হয়ে যায় না।
২। পর্দানশীল হওয়া সত্ত্বেও একজন মেয়ে-মহিলা ধর্ষণের শিকার হতে পারেন।
৩। ধর্ষণের জন্য মূল দায়ী ধর্ষক; তিনি পুরোহিত হোন, পোপ হোন বা মসজিদের ইমাম।
৪। একটা সমাজের সামাজিক অবকাঠামো, বিচারব্যবস্থা দূর্বল থাকলে সেই সমাজে ধর্ষণের মাত্রা বেশি থাকবে।
৫। পোশাকের পর্দা একজন নারীকে নানাবিধ সুরক্ষা দেয়, সমাজের বেশিরভাগ মানুষ তার দিকে সম্মানের সাথে তাকায়। পোশাক তাকে সম্মান দেয়, কিন্তু সুযোগ সন্ধানী ধর্ষকের কাছে সে নিরাপদ না।
কোন মন্তব্য নেই