শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো (ইসলাম ও বিজ্ঞান)

 দুধ মানুষের জন্য অপূর্ব নিয়ামত। আধুনিক বিজ্ঞান বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বলছে, দুধে এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা জমিনের ওপরে অন্য কোনো খাদ্যে পাওয়া যায়না। মানুষের খাদ্যতালিকায় দুধের চেয়ে উত্তম কোনো খাদ্য নেই। এই দুধে মানব শরীরেরপ্রয়োজনীয় সব ধরনের খাদ্য উপাদান রয়েছে। তাই এই দুধ সন্তানের জন্য যেমন উপকারী, তেমনি উপকারী যুবক, বৃদ্ধসহ সব মানুষের জন্য। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই দুধ কিভাবে সৃষ্টি হয়? এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন, 'নিশ্চয়ই চতুষ্পদ প্রাণীর মধ্যেও তোমাদের জন্য শিক্ষার বিষয় রয়েছে। আমি তোমাদের পান করাই এদের শরীর থেকে, এদের মলমূত্র ও রক্তের মধ্যবর্তী বস্তু থেকে নিঃসৃত দুধ, যা পানকারীদের জন্য উপাদেয়।' (সুরা নাহল, আয়াত ৬৬)

ডা. মুহাম্মাদ গোলাম মুয়ায্যাম বলেন, প্রাণীর মলমূত্র ও রক্তের মধ্যবর্তী অবস্থা থেকে দুধ সৃষ্টি করার কথাটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক, যদিও বিজ্ঞান এ জ্ঞান অর্জন করেছে কোরআন নাজিলের প্রায় ১২০০ বছর পর। গরু, মহিষ, উট, ছাগল, দুম্বা ইত্যাদি দুধ প্রদানকারী প্রাণী ঘাস ও তৃণলতাদি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে, যা তাদের পরিপাকযন্ত্রে হজম হয়। খাদ্যের পরিত্যাজ্য বস্তুগুলো মল বা গোবর হিসেবে পরিত্যক্ত হয়। গ্রহণযোগ্য বস্তুগুলো অন্ত্র থেকে রক্তে প্রবেশ করে। রক্ত শরীরের সব কোষকে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্যাদি সরবরাহ করে এবং কোষ থেকে দূষিত পদার্থ গ্রহণ করে প্রশ্বাস ও মূত্রের মাধ্যমে পরিত্যাগ করে। সুতরাং পুষ্টিকর বস্তুগুলো রক্তে প্রবাহিত হয়। যেসব গ্রন্থি (যেমন দুধের বাঁট, পিটু, হটারী) দুধসৃষ্টিতে অংশগ্রহণ করে, সেগুলোর জীবকোষগুলো তাদের প্রয়োজনীয় বস্তুগুলো রক্তের মাধ্যমেই পেয়ে থাকে। এমনিভাবে দুধের মাখন, চিনি, ভিটামিন, প্রোটিন ইত্যাদি রক্ত দ্বারা সরবরাহ করা হয়। রক্তের এ বস্তুগুলো খাদ্য থেকে আসে, তা থেকে মল ও মূত্র পরিত্যক্ত হয়। রক্ত দুধের প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করে সেসব গ্রন্থি থেকে চলে যায়। সুতরাং মলমূত্র ও রক্তের মধ্যবর্তী অবস্থা থেকেই দুধের সৃষ্টি হয়ে থাকে। কত সুন্দর করে এবং কত সংক্ষেপে আল্লাহ এ কুদরতের বর্ণনা দিলেন। পুরো কোরআন শরিফ বৈজ্ঞানিকদের আরো গবেষণার প্রেরণা দেবে। এ বৈজ্ঞানিক তথ্যটি প্রায় ১৪০০ বছর আগে 'উম্মি' নবীর ওপর নাজিল করা কোরআনেই প্রথম উদ্ঘাটিত হয়। এমনিভাবে আল্লাহ মানুষকে বস্তুজগতে বহু বিষয়ের অর্থাৎ বিজ্ঞান সম্পর্কে ইঙ্গিত করেছেন, যা কোরআনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। কোরআনে ঘোষণা করা হয়েছে- 'সন্তানের পিতার দায়িত্ব হলো ন্যায়ভাবে স্তন্যদানকারীর খোরপোশের ব্যবস্থা করা, কাউকে তার সাধ্যের অতীত কষ্ট প্রদান করা যাবে না। না মাকে তার সন্তানের জন্য কষ্ট দেওয়া যাবে, না পিতাকে তার সন্তানের জন্য কষ্ট দেওয়া যাবে। অভিভাবকেরও অনুরূপ দায়িত্ব। তেমনিভাবে ধাত্রী দ্বারা দুধ পান করালে তোমরা ন্যায়ভাবে যা দেওয়া সাব্যস্ত করেছ, তা দিয়েসম্মত করে দাও, তাহলে এতে তোমাদের কোনো দোষ নেই।' (সুরা বাকারা, আয়াত ২৩৩)। 'আমি মুসার মাকে ইঙ্গিতে নির্দেশ দিলাম, তাকে দুধ পান করাও।' (সুরা কাসাস, আয়াত ৭)। 'তার মা কষ্ট স্বীকার করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে এবং কষ্ট স্বীকার করে জন্ম দিয়েছে এবং তার অন্তঃসত্ত্বা থেকে শুরু করে দুধ ছাড়ানো পর্যন্ত ৩০ মাস লেগে গেছে।' (সুরা আহকাফ, আয়াত ১৫)
অন্য কোনো দুধই শিশুর জন্য মায়ের দুধের বিকল্প হতে পারে না। যেসব মহিলা নিজ সন্তানকে দুধ পান করায় না অথবা এ ভয়ে শিশুকে নিজের দুধ থেকে বঞ্চিত রাখে যে দুধ পান করালে তার রূপ-যৌবন ও কমনীয়তা নষ্ট হয়ে যাবে-এসব মা শিশুর অধিকার ক্ষুণ্ন করেন। এ ধ্যান-ধারণা পোষণকারী মহিলাদের ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। মিরাজের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে হজরত আবু ওমামা আল বাহিলিবর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন- 'অতঃপর আমাকে আরো সামনে নিয়ে যাওয়া হলো। এ সময় কয়েকজন মহিলাকে দেখলাম, যাদের বুকের ছাতি সাপ দংশন করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, এরা কোন মহিলা? বলা হলো, তারা সেসব মহিলা, যারা নিজের শিশুকে নিজের দুধ পান করাত না।' (আল মুসতাদরাকু আলাস সাহিহাইন, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২২৮, হাদিস নম্বর ২৮৩৭)।
শিশুর জন্য বুকের দুধই সেরা খাবার। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে শিশুকে শালদুধ খাওয়ানোর পর মায়ের দুধের পাশাপাশি প্রায় ছয় মাস তার অন্য খাবার বা পানীয়ের দরকার নেই। জন্মের পরপরই শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করতে হবে। শিশুকে ঘন ঘন স্তন চুষতে দিলে মায়ের বুকে যথেষ্ট দুধ তৈরি হয়। ছয় মাস বয়স পূর্ণ হলে শিশুর নানা ধরনের বাড়তি খাবার প্রয়োজন হয়। শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে ছয় মাস পর্যন্ত বলতে গেলে মায়ের গর্ভধারণের সম্ভাবনা একেবারেই থাকে না। গবেষণা শেষে এমন তথ্যই চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন।
কোরআন শরিফে কিছু নির্দেশনা রয়েছে, যা একটিশিশু ও তার পরবর্তী ভাই-বোনের জন্মের মধ্যেএকটি সময়ের ব্যবধানকে অবশ্যম্ভাবী করে দেয়। মূলত দুই বছরে শিশুর দুধ ছাড়ানোর এবং গর্ভধারণ ও দুধ ছাড়ানোর জন্য ৩০ মাসের উল্লেখ করার তাৎপর্য এটাই। এ থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয়, যারা শিশুদের স্তন্যদান করতে চায়, তারা যেন পুরো দুই বছর শিশুকে দুধ পান করায়। এ সবই মায়ের স্বাস্থ্যের পুনরুদ্ধার। গর্ভধারণের কারণে যে জীবনীশক্তি ক্ষয়ে গেছে, তা পুনরুদ্ধার এবং শিশুর সুস্থতার নিশ্চয়তা বিধান ও প্রাকৃতিক পন্থায় দুধ পানের মাধ্যমে তার অধিকার আদায় করাই উদ্দেশ্য। চিকিৎসাবিজ্ঞান দীর্ঘদিন কৃত্রিম দুধের পক্ষে ওকালতি এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এখন মায়ের বুকের দুধের পক্ষে কোরআন তথা ইসলামের পক্ষেই জোরালো সমর্থন দিচ্ছে। বস্তুত শিশুর জন্য মায়ের দুধ অপরিহার্য। মায়ের বুকের দুধ হচ্ছে শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানযুক্ত আল্লাহপ্রদত্ত এমন তৈরি খাবার, যা শিশু সহজেই হজম করতে পারে এবং শিশুর শরীর সহজেই কাজে লাগিয়ে দেহের বৃদ্ধি ঘটিয়ে থাকে।মজার ব্যাপার হলো, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিশুর দেহের খাদ্য চাহিদার যে পরিবর্তন ঘটে, মায়ের বুকের দুধের উপাদানে অনুরূপ পরিবর্তন প্রতিনিয়ত ঘটতে থাকে। তাইশিশুর জন্য মায়ের দুধের বিকল্প নেই। যে তাপমাত্রায় শিশুর শরীর সহজেই দুধ খেয়ে কাজে লাগাতে পারে, বুকের দুধে ঠিক সেই তাপমাত্রাই। মায়ের বুকের দুধে বেশ কিছু রোগ প্রতিরোধক উপাদান থাকে। যেমন- আইজিএ (IGA), ল্যাকটোফেরিন এবং লাইসোজাইম। এ ছাড়া মায়ের দুধে প্রচুর শ্বেত রক্তকণিকা থাকে, সেগুলো আবার আইজিএ, ল্যাকটোফেরিন, লাইসোজাইম, ইন্টারফের তৈরি করে।
বাইফিজস ফ্যাক্টর নামে আরো একটি পদার্থ মায়ের দুধে পাওয়া যায়। এসব উপাদান সংক্রামক রোগ প্রতিরোধক। (Dr. F Savge king, Helping Mothers to Beast Feed,Published in 1992, By the African Madical, Reachars Foundation (AMRE), Nairobi Cania)
এগুলো পানি মিশিয়ে বোতলে করে রাবারের বোঁটা দিয়ে খাওয়াতে হয়। এর কোনোটাতেই শিশুর দেহের সঙ্গে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ তাপমাত্রা এবং উপাদানে পাওয়া যায় না। দিনে দিনে শিশুর শরীরের চাহিদায় যে পরিবর্তন ঘটে- গরু, ছাগল বা কৃত্রিম দুধ দ্বারা তা পূরণ সম্ভব নয়। তা ছাড়া কৃত্রিম দুধে বিভিন্ন পাত্রের সাহায্য নিতে হয় বলে রোগজীবাণু দ্বারা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়। গবেষণালব্ধ তথ্যে জানা যায়, জন্মের পরপ্রথম চার থেকে ছয় মাস পর্যন্ত কৃত্রিম দুধপানকারী শিশুর ডায়রিয়ার প্রকোপ মায়ের দুধপানকারী শিশুদের তুলনায় তিরিশ গুণ বেশি। নবজাতকের স্বাস্থ্য ও শরীরের জন্য দুধ খুবই উপাদেয়। হাদিস ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে এ দুধের উপকারিতারকথা প্রমাণিত। শিশুসন্তান জন্মের পর শিশুরযা যা প্রয়োজন, সব কিছুই শালদুধে আছে। শালদুধে অনেক বেশি রোগ প্রতিরোধক উপাদান ও শ্বেতকণিকা থাকে। এসব উপাদান শিশুকে বিভিন্ন রোগজীবাণু থেকে রক্ষা করে। বলা হয়,শালদুধ হচ্ছে শিশুর প্রথম টিকা। শালদুধে যেসব উপাদান আছে, তা শিশুর কচি ও অপরিণত পেটপরিপক্ব হতে সাহায্য করে। এসব গ্রোথ ফ্যাক্টর শিশুর অন্ত্রনালিকে দুধ হজম করাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া যেসব আমিষজাতীয় দ্রব্য শরীরে গেলে শিশুর ক্ষতি হতে পারে, তা পেট থেকে শরীরের ভেতরে ঢুকতে এসব গ্রোথফ্যাক্টর বাধা দান করে। শালদুধ দেওয়ার আগে গরুর দুধ বা অন্য কোনো খাবার দেওয়া হলে শিশুর অন্ত্র পরিপক্ব হয় না; বরং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে তার অ্যালার্জি হতে পারে। শালদুধ একটি রেচকের কাজ করে এবং শিশুর পেটের প্রথম কালো পায়খানা বা 'মিকোনিয়াম বের করে দিতে সাহায্য করে। মিকোনিয়াম বেশিক্ষণ পেটে থাকলে শিশুর জন্ডিস হওয়ার আশঙ্কা থাকে। (Dr. F. Savage king, Helping Mothersto Brest Feed, আফ্রিকান মেডিক্যাল রিসার্স ফাইন্ডেশন, (এএমআরএফ) নাইরোবি, কেনিয়া, পৃষ্ঠা ১৫-১৬; খন্দকার মনিরুল ইসলাম সম্পাদিত (শিশু ও মহিলাদের উন্নয়ন কার্যক্রম দ্বিতীয় পর্যায়) ঢাকা : তথ্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ সচিবালয় ও ইউনিসেফ, ২০০৪, পৃষ্ঠা ৮৬৮৮)

কোন মন্তব্য নেই

dem10 থেকে নেওয়া থিমের ছবিগুলি. Blogger দ্বারা পরিচালিত.